জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ;
কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল এলাকাজুড়ে একটি সুউচ্চ বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ চলছে। বন বিভাগের আপত্তি ও লিখিত নিষেধাজ্ঞার পরও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপাড়া শালবাগান এলাকায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প-সংলগ্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বাউন্ডারিটি নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এনজিও ও প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই কাজটি করা হচ্ছে। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) কার্যালয় জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের পক্ষ থেকে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কাছে লিখিতভাবে আপত্তি জানানো হয়েছে। গত ২৬ মে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, ২৬ নম্বর শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচল করিডোর রয়েছে। নিয়মিতভাবে হাতি এ পথ ব্যবহার করে চলাচল করে। করিডোরজুড়ে বাউন্ডারি নির্মাণ করা হলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নির্মাণাধীন বাউন্ডারিটির উচ্চতা প্রায় ৫ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭ মিটার। বর্তমানে মূল কাঠামোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে; কেবল প্লাস্টার ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি।
নির্মাণকাজ তদারকিতে নিয়োজিত মুখতার নামে এক প্রতিনিধির দাবি, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যই এ অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বনের ভেতরে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এলাকাটি অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান ও ন্যাচার পার্ক এলাকায় প্রায় ২৭০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাতি, বানর, শিয়াল, বনমোরগ, ভাল্লুক, বিভিন্ন সরীসৃপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের পর থেকেই এসব প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হয়েছে। অনেক প্রাণী গভীর বনে আশ্রয় নিয়েছে, আবার কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
বন ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, লেদা থেকে শালবাগান ও ন্যাচার পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত বনাঞ্চলটি বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও খাদ্যভূমি। সেখানে স্থায়ী বাউন্ডারি নির্মাণ প্রাণীদের চলাচল ও প্রজনন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টেকনাফ রেঞ্জের বন পাহারা দলের সদস্যরা জানান, ওই এলাকায় এখনো বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। কিন্তু বনাঞ্চলে মানুষের উপস্থিতি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের আগে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট-ইআইএ) করা প্রয়োজন। এতে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।”
এ বিষয়ে ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। যতদূর জানি, আরআরআরসির মাধ্যমে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।”
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতি চলাচলের করিডোরে বাউন্ডারি নির্মাণের বিষয়টি জানার পর আমরা লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছি এবং কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছি। বন ও বন্যপ্রাণীর স্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”
পরিবেশবাদীদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত থাকলে টেকনাফের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
